হিমাগারে ইলিশের স্তূপ

করোনাভাইরাসের উপদ্রপে হিমাগারে ইলিশের স্তূপ, ইলিশের বিক্রি প্রায় বন্ধ

প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ আসার আগেই অনেকে ইলিশ কিনে ফেলেন। উৎসবের দিনটি যত ঘনিয়ে আসে ইলিশের দামও তত বাড়তে থাকে।

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রিতা হক গত কয়েকবছর পহেলা বৈশাখ আসার আগে সাধারণত কয়েকটি ইলিশ কিনে ফ্রিজে রেখেছেন। কিন্তু এবার বাজারের ধারে কাছেও যাননি। তিনি বলছেন, “মনটাই ভালো নেই। এরকম দুর্যোগের দিনে এসব খাওয়ার ইচ্ছেটাই করছে না।

”তাছাড়া করোনার কারণে বাজারে যাওয়াও কমিয়ে দিয়েছি। বাজারে যেতেই ভয় করে।”

হিমাগারে ইলিশের স্তূপ

পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার ধূম পড়ে যায়। এসময়ের জন্য অনেক মাছ ব্যবসায়ী অপেক্ষা করে বসে থাকেন।

এবারও বেশ আগেভাগেই অনেকে হিমাগারে মাছ রেখেছিলেন। কিন্তু তা এখন হিম হয়েই আছে। রান্নার কড়াই পর্যন্ত যায়নি বেশিরভাগই।

দেশের সবচাইতে বড় মাছের আড়ত চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে একটি হিমাগারের প্রধান নির্বাহী ওমর ফারুক মামুন।

তিনি বলছেন, “এখন আমার মজুদ আছে ৪০ হাজার কিলোগ্রাম। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এক কিলোগ্রামও বিক্রি হয়নি। আমরা সারা বছর মাছ সংগ্রহ করি। কিন্তু চীনে করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর থেকে গত কয়েকমাস রপ্তানি বন্ধ। আমরা আশা করে বসেছিলাম যে পহেলা বৈশাখে হয়ত কিছু ব্যবসা হবে।”

তিনি বলছেন, শুধু তার হিমাগার থেকেই পহেলা বৈশাখে কয়েকশ টন ইলিশ বিক্রি হতো। সাধারণত পহেলা বৈশাখের দিন পনেরো আগে থেকে খুচরা বিক্রেতারা তাদের কাছ থেকে ইলিশ মাছ কিনতে শুরু করতেন। চট্টগ্রামে কয়েকদিন থেকে দেখেশুনে মাছ কিনতেন তারা।

তিনি বলছেন, সবচেয়ে বেশি আসেন ঢাকার ক্রেতারা। চট্টগ্রামের বাজারগুলোতেও বিক্রি হতো। বঙ্গোপসাগরে ধরা গভীর সমুদ্রের ইলিশ মাছ বিক্রি করার জন্য নিজেরাই হিমাগারে মজুদ করেন বলে জানাচ্ছেন ওমর ফারুক মামুন।

জেলেরাও বাড়িতে

মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামের পরিমল পালো ১৬ বছর বয়স থেকে মাছ ধরেন।

তিনি বলছেন, পরিবহন বন্ধ, তাই ঢাকা থেকে তাদের কাছে কোন পাইকাররা আসেননি। সাধারণত মাওয়া ঘাটে মাছ বিক্রি করেন তারা।

মুনশিগঞ্জের মাওয়া ও লৌহজং-এ পদ্মার অংশে, চাঁদপুর থেকে সুরেশ্বর, শরিয়তপুরের জাজিরা, নোয়াখালীর হাতিয়া এসব জায়গায় সাধারণত তারা মাছ ধরেন।

তবে এখন মাছ ধরাও বন্ধ। পরিমল পালো বলছেন, অনেক এলাকা থেকে জেলেরা ইলিশের মৌসুমে এর প্রধান বিচরণ ক্ষেত্রগুলোতে চলে আসেন। কিন্তু এবার তারা বাড়ি ফিরে গেছেন।

বাজারে ক্রেতা নেই, দামও নেই

গত কয়েক বছর ইলিশ বিক্রেতাদের বেশ ভাল সময় গেছে। ইদানিং দেশে সারা বছরই ইলিশ পাওয়া যায় কেননা ইলিশের প্রজনন অনেক বেড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসেবে গত দশ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ও সাগর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়।

তাদের দেয়া হিসেবে ২০০৭ সালে প্রায় তিন লক্ষ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়েছিলো। ইলিশ রক্ষায় সরকার বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কয়েক দফা জাটকা ও মা-ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকে।

আর তাতে ইলিশের মৌসুম নয় এমন সময়েও ইলিশ ধরা পড়ছে। সৈয়দ হাসান তওসিফ ঢাকার মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেট নতুন কাঁচাবাজারে মাছের খুচরা বিক্রেতা। সাত বছর বয়স থেকে মাছের বাজারে কাজ করেছেন।

তিনি বলছেন, যারা প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের আগে মাছ কিনে ফ্রিজে রেখে দিত সেসব নিয়মিত ক্রেতার এবার আসেননি।

তিনি বলছেন, “গত বছর পহেলা বৈশাখে এক কেজি ইলিশের দাম ছিল আড়াই হাজার পর্যন্ত। কিন্তু এবার এক কেজির চেয়ে বেশি ওজনের মাছে তিনি বিক্রি করেছেন সর্বোচ্চ নয়শ টাকায়। দাম কম আবার বিক্রিও হয় নাই, কারণ বাজারে ক্রেতা নেই।”

তিনি বলছেন, পহেলা বৈশাখের আগের দিন তার কাছে ৪০ টি ইলিশ ছিল। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখনো রয়ে গেছে।

তিনি বলছেন একে তো ক্রেতারা আসতে ভয় পাচ্ছেন। তাছাড়া দুপুর দুইটার মধ্যে বাজারের সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। তাই বিক্রির সময়টাও সীমিত হয়ে গেছে।

সবমিলিয়ে ইলিশ খাওয়ার রুচি ছিল না অনেকের। অনেকে হয়ত পরিস্থিতির কারণে বাজারে যাওয়া এড়িয়ে গেছেন। তাই হিমাগারে স্তূপ হয়ে রয়েছে জনপ্রিয় ইলিশ। “জীবনে এমন খারাপ দিন আর দেখিনি”, বলছেন সৈয়দ হাসান তওসিফ।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি বাংলা।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *