সিডনিতে উম্মোচিত হলো দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ

একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গত রবিবার সিডনিতে উম্মোচিত হলো দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ। একুশে ফেব্রুয়ারি ২০২১ সকাল ১১ টায় সিডনির বেলমোরের পীল পার্কে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ।
ক্যান্টারব্যুরি- ব্যাংক্সটাউন কাউন্সিলের উদ্যোগে বাংলাদেশী অধ্যুষিত লাকেম্বার পার্শ্ববর্তী সাবার্ব বেলমোরের পিল পার্কে (Peel Park) স্থাপিত এই স্মৃতিসৌধটি উম্মোচন করেন কাউন্সিলের মেয়র খাল আশফর, কাউন্সিলর নাজমুল হুদা, কনসাল জেনারেল খন্দকার মাসুদুল আলম, ফেডারেল এমপি টনি বার্ক। এসময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় মেয়র খাল আসফার, স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন কমিটির টিম লিডার কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাজমুল হুদা, মুনীর হোসেন, আব্দুল্লাহ আল নোমান শামীম, শাহে জামান টিটু, লিঙ্কন শফিকউল্লাহ সহ বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতারা।
ক্যান্টারবারি ব্যাংকসটাউন সিটি কাউন্সিলের মেয়র খাল আসফর অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ কমিউনিটি নির্বাচিত কাউন্সিলর মোহাম্মদ হুদা উদ্যোগ এবং প্রাক্তন কাউন্সিলর শাহে জামান টিটুকে অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ দেন, সেই সাথে এই কাজের সাথে যুক্ত মুনীর হোসেইন, আব্দুল্লাহ আল নোমান শামীম ও লিঙ্কন শফিকুল্লাহকেও ধন্যবাদ জানান। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন বাংলাদেশী অস্ট্রেলিয়ানদের, যারা এই স্মৃতিসৌধ তৈরী করতে আর্থিক সাহায্য করেছেন। মেয়র বলেন, “কাউন্সিলের আজকে একটি গর্বের দিন কেননা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই দিনটিতেই আমার কাউন্সিলে স্মৃতিসৌধটি অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে পেরেছি।”


অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল এম পি টনি বার্ক বলেন, ”পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে প্রতি বছরই মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও আদিবাসীদের শতধিক মাতৃভাষা হারিয়ে গিয়েছে। ১৯৫২ সালের তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চাপিয়ে দেয়া ভাষার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান জেগে উঠে তাদের ভাষা রক্ষার জন্য। বহু সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষরা। আর সেই কথা স্মরণ করেই আজ পৃথিবী জুড়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।”
বাংলাদেশী কাউন্সিলর মোহাম্মদ হুদা বলেন, “আজকে আমি কাউন্সিলর হিসেবে নিজেকে খুবই ধন্য মনে করছি আমাদের বাংলাদেশ কমিউনিটির তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের জন্য একটি স্মৃতিসৌধ করতে পেরেছি কাউন্সিলের সহায়তায়। আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ডিজাইন, অর্থ সংগ্রহ এবং কমিউনিটির অন্যান্য সংগঠনের প্রতিটি সদস্যকে যারা আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন।” এ সময় তিনি তাঁর পুরো কাজের অকৃত্তিম সহযোদ্ধা টিটো শাহে জামান, স্মৃতিসৌধের প্রাথমিক ধারনার জন্য মুনীর হোসেইনকে, আব্দুল্লাহ আল নোমান শামিম, লিঙ্কন শফিকুল্লাহকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ হাই কমিশনের সিডনির কনসোলেট জেনারেল খন্দকার মাসুদুল আলম বলেন,”১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন ধরেই পরবর্তীতে একটি নতুন দেশের জন্ম হতে পারে ভাষার জন্য এই বিরল উদাহরণ পৃথিবীর বুকে শুধুমাত্র একটি দেশের ই আছে তার নাম বাংলাদেশ। আজ আমার অহংকার লাগছে সেই ২১ শে ফেব্রুয়ারী এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পৃথিবীতে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে সরকারি ভাবে আরও একটি মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে।”


ফারিয়া নাজিম ও অমিয়া মতিনের সাথে সমবেত কণ্ঠে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী”গানটি গেয়ে ভাষা শহীদদের স্বরণ করেন উপস্থিত সবাই। ডাঃ তানভীর, রেমন্ড সোলেমন, কানিতার অনবদ্য আয়োজনও কাউন্সিলর হুদা উল্লেখ করেছেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন শেষে পুস্পস্তবক অর্পন করেন ফেডারেল এমপি টনি বার্ক। পিল পার্কের নতুন এ মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধটির নকশায় একজন মা ও ডানে–বাঁয়ে তাঁর দুই সন্তানকে আগলে রেখেছেন এবং ওপরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা সাদৃশ্য প্রতীক রয়েছে। ম্যুরালটির পেঁছনে রয়েছে পাঁচটি ভাষায় লেখা একটি বিবৃতি। সেটি হলো: মাতৃভাষা আমাদের স্বত্বার অংশ। মায়ের ভাষাকে নিজে ধারন করুন এবং আপনার সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে দিন। মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে লেখায়, পড়ায় এবং বলায় এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
এর আগে স্থানীয় প্রবাসীদের উদ্যোগে একটি গালা ডিনারে বাংলাদেশিরা প্রায় ৪৩ হাজার ডলার সংগ্রহ করে কাউন্সিল তহবিলে দিয়েছে। সেই হিসেবে এই ম্যুরালটির সঙ্গে বাঙালি কমিউনিটির ওতপ্রোত অবদান রয়েছে।


উল্লেখ্য, কাউন্সিলের সরাসরি আয়োজন ও ব্যাপক কোভিড রেস্ট্রিকশনের কারনে কাউন্সিল স্মৃতিসৌধ উম্মোচন অনুষ্ঠানে মাত্র ১০ জন কম্যুনিটি মেম্বারকে দাওয়াত করেছিলো। যেহেতু একান্ত কাউন্সিলের প্রোগ্রাম, সেহেতু ইচ্ছে থাকা সত্বেও এই প্রোগ্রামে সামাজিক আন্দোলনের কাউকেই দাওয়াত করা সম্ভব ছিলো না, সেটা আমরা অনুভব করেছি। দীর্ঘদিন ধরে শুধু ভাষার আন্দোলনের সাথে জড়িত একুশে একাডেমী অস্ট্রেলিয়া এবং সাংস্কৃতিক ছোট একটি দলকে প্রয়োজনের কারনে অনুরোধ করা হয়েছিলো, তাদেরকে হৃদয় থেকে ধন্যবাদ সহযোগিতা করার জন্য। তবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, কোভিড কালের পরে অচিরেই সমাজের সবাইকে নিয়ে উম্মুক্ত একটি অনুষ্ঠান আমরা এই পার্কেই একসাথে করবো।
উল্লেখ্য, এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ, এটি শহীদ মিনার নয়। মাল্টিকালচারাল কম্যুনিটিতে আমাদের শহীদ মিনার করার সুযোগ সীমিত, তাই এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ হিসেবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ২০০৬ সালে সিডনির অ্যাশফিল্ড পার্কে বাংলাদেশিদের উদ্যোগে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। সেই থেকে সেখানেই প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা এবং একুশের অনুষ্ঠান হয়ে আসছিলো।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *