সন্তানের জন্য মায়ের লড়াই, বিপদ জেনেও আগলে রাখেন মা

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে নিরবে করোনার যন্ত্রণা সয়ে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে কম বয়সী রোগীটি। ১০ মাস বয়স তার, চন্দনাইশে বাড়ি। আন্তরিকতার কমতি নেই, তবু অন্যরা তো বটে, চিকিৎসকরাই রীতিমতো ২০ ফুট দূরে থেকে নিয়মিত দেখে যাচ্ছেন দুগ্ধপোষ্য এই রোগীকে। হিসেবের বাইরে শুধু একজন, ওই একজনই কেবল এ সবকিছুর বাইরে— ভয়ডরহীন! করোনার সাক্ষাৎ ঝুঁকি তার কাছে তুচ্ছ। মনের সমস্ত বাধা তার কাছে ঠুনকো। কী দিন কী রাত— কচি কন্ঠে যখনই ওঠে কান্নার রোল, চোখের জলে ভেজা শাড়ির আঁচল গুটিয়ে মানুষটি ছুটে যান শিশুটির পাশে।

তিনি মা! সুস্থ সাধারণ এই মা নিজেও জানেন, করোনা রোগীর সংস্পর্শে এলে নিজেরও আক্রান্ত হওয়ার প্রায় শতভাগ ঝুঁকি। কিন্তু মমতাময়ী মায়ের মন কি কোনো বাধা মানে? বাইরে বৃষ্টির জল আর চোখের জলও একসময় মিলেমিশে একাকার হয়, জেনারেল হাসপাতালের পুরনো জানালার চৌকাঠ পেরিয়ে একজোড়া উদাসী চোখ প্রতিদিন ভাবে শুধু— কবে কোলে ফিরবে তার বুকের ধন‍?

চট্টগ্রামে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় করোনা আক্রান্ত রোগী তুলনামূলক কম হলেও দেশের সবচেয়ে কম বয়সী করোনা রোগীটিই শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামে। চন্দনাইশের ১০ মাস বয়সী এক শিশু গত ২১ এপ্রিল করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়। করোনা পজিটিভ এই শিশু বর্তমানে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন আছে। করোনা পজিটিভ না হলেও শিশুটির মাও অন্য ২৩ জন করোনা রোগীর সাথে ঝুঁকি নিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকছেন মাতৃত্বের টানে।

করোনার সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা না থাকলেও আপাতত দুটি ট্যাবলেট দিয়েই চলছে করোনার চিকিৎসা। তবে ১০ মাস বয়সী এই শিশুটিকে সে চিকিৎসা দেয়ারও কোন উপায় নেই। তাহলে কিভাবে চলছে ১০ মাস বয়সী এই রোগীর চিকিৎসা? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আব্দুর রব চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘বাচ্চাটিকে তো ট্যাবলেট দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা ওর মাংসে ইনজেকশন দিচ্ছি।’

ডা. আব্দুর রব বলেন, ‘শিশুটির মাও তার সাথে আইসোলেশন ওয়ার্ডে আছেন। যদিও তিনি করোনা আক্রান্ত নন। কিন্তু করোনার এই কেসটা খানিকটা ভিন্ন। স্বাভাবিকভাবেই এত ছোট বাচ্চাকে জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখতে রাজি ছিলেন না তার মা। এটা বেশ কঠিনও।’

শিশুটির মাকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েই আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে জানিয়ে জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক অসীম কুমার নাথ বলেন, ‘শিশুটির সাথে তার মাও আইসোলেশন ওয়ার্ডে আছেন। মাকে তার সুরক্ষার জন্য সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে।’

ডা. আব্দুর রব বলেন, ‘যদিও সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে তবুও ওই শিশুটির সাথে তার মায়ের তো একদমই ক্লোজ কন্ট্যাক্ট। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে হচ্ছে উনাকে। এছাড়া শিশুটি কার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছে, সেটিও এখনও জানা যায়নি। এমনকি তার মাকেও এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। আমরা ২৪ এপ্রিল শিশুটির মায়ের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। দেখি কী ফলাফল আসে।’

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল শিশুটি। শিশুটির শরীরে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখে সেখানকার চিকিৎসকেরা নমুনা টেস্টের জন্য ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি (বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল আন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস) হাসপাতালে পাঠায়। ২১ এপ্রিল পরীক্ষার ফলে করোনা পজিটিভ আসে শিশুটির। করোনা শনাক্তের পর শিশুটিকে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে শিশুটি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এর আগে পটিয়া উপজেলায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুর করোনা পজিটিভ আসে। তবে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির আধা ঘন্টার মধ্যেই ওই শিশু মারা যায়। পটিয়ার হাইদগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা এক প্রবাসী ছেলে মারা যাওয়া শিশুটি। তবে করোনা পজেটিভ হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সে ছেলের সাথে হাসপাতাল আসা, আবার মৃত শিশুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া, গোসল করানো সবই করেছেন মা। বাবা স্বয়ং নিজের কোলে করে ছেলে অন্তিম শয্যায় শায়িত করেছিলেন। যে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে।

করোনার এই সময়ে বেশ কিছু উদাহরণ তৈরি হয়েছিল প্রথমদিকে যেখানে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জে এক গায়ক করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার পর তার লাশও দেখতে যাননি পরিবারের সদস্যরা। কিংবা এক মায়ের করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ায় মাকে জঙ্গলে ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে দেশে। সেখানে পটিয়া ও চন্দনাইশের দুই শিশু রোগীর ক্ষেত্রে যা দেখা গেল, তাতে চিরচেনা সেই রূপটিই দেখা গেল আবার— পৃথিবীর হাজারো সম্পর্কের ভিড়ে বাবা-মা-সন্তানের সম্পর্কের কোনো তুলনা হয় না।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *