রোহিঙ্গা শরনার্থী থেকে অস্ট্রেলিয়ান বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন

থাকতেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ১৬ বছর বয়সে পালিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে। আর সেখানেই হয়ে গেলেন বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা আইসিএন ক্লাসিক বিজয়ী।

শুনতে স্বপ্নের মত শোনাচ্ছে তো? স্বপ্ন হলেও ঘটনাটি সত্যিই। আর এ ঘটনার মাধ্যমেই ইতিহাস গড়েছেন নূর কবির।

অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম এবিসির সূত্র অনুযায়ী, নূর কবির হলেন সর্বপ্রথম রোহিঙ্গা যিনি এই ধরনের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির গড়েছেন।

তবে বিশ্বজয়ের পথটা মোটেও সহজ ছিল না নূর কবিরের জন্যে। নূর কবিরের জন্ম এক শরণার্থী শিবিরে। অন্যান্য শরণার্থীর মত নূর কবিরকেও বেঁচে থাকতে হতো সরকার আর এনজিও কর্তৃক পাওয়া রেশনের ওপর। তখন থেকেই তিনি কঠোরভাবে খাদ্যগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা মনে করে নূর কবির বলেন, “ক্যাম্পে থাকার দিনগুলোতে ঠিকমতো খেতেই পারতাম না। না ছিল পর্যাপ্ত খাবার, না ছিল রুটি-পানি। বিশুদ্ধ পানির বড় অভাব ক্যাম্পে। কখনো কখনো দিনে একবার খেয়ে থাকতে হতো।”

তিনি আরও বলেন, আমরা শিবিরের বাইরে যেতে পারতাম না। তাই রেশনের ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে তা পর্যাপ্ত ছিল না। ওই আশ্রয় শিবিরে মাত্র ৫ বর্গ মিটারের একটি রুমে বসবাস করতে হতো আমাদের সাতজনকে। সেখানেই ১৫ বছর বসবাস করেছি। এটাকে ভালভাবে জীবনযাপন বলে না। তাই আমি নতুন করে জীবন শুরুর পরিকল্পনা করি।

সেই পরিকল্পনা থেকেই চলে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। নূর কবির জানান, তার মা প্রায় দুই সপ্তাহ তার খোঁজ পাননি। তিনি ভেবেছিলেন নূর হয়তো মরেই গেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় যাবার পর নূর কবির সাময়িকভাবে থাকার জন্য অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ব্রিজিং ভিসা পান। পরে দুই বছর ফর্ক্লিফট ড্রাইভারের কাজ করেন। ২০১৭ সালে ব্রিসবেনে তার সাক্ষাৎ হয় স্বেচ্ছাসেবী শরণার্থী বিষয়ক প্রশিক্ষক ফিল নিক্সনের সঙ্গে। এখান থেকেই ঘুরে যায় নূর কবিরের জীবনের চাকা।

নূর কবিরের স্বাস্থ্য ছিল বেশ ভাল। তার সুঠাম স্বাস্থ্য থেকে ফিল নিক্সনই তাকে উৎসাহিত করেন বডি ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে। যদিও বন্ধুদের সাথে মজা করতেই জিমে গিয়ে ফিলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল নূর কবিরের।

অবশেষে একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নূর কবির। তার মধ্যে দৃঢ় মনোবাসনা দেখা দেয়। বডিবিল্ডিং তাকে আকৃষ্ট করে। গত বছর তাকে পাঠানো হয় ফিটনেস কোচ সিমন স্ট্রোকটনের কাছে।

নূর কবির বলেন, বডিবিল্ডিং বা প্রতিযোগিতা সম্পর্কে তখনও কিছুই জানতাম না। তবে এটা জানতাম স্ট্রোকটন মানুষদেরকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রশিক্ষণ দেন। তাই তার কাছেই গেলাম। তাকে আমার পিছনের ইতিহাস বললাম। বললাম কি করতে চাই। স্ট্রোকটন তার মাঝে তখনই এক অদম্য শক্তি দেখতে পান।

স্ট্রোকটন বলেন, “ওর গল্প শুনে আমি অবাক হই। এমন মানুষের সফল হওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকে। নুরের সেই ইচ্ছাটা আছে। আমি বিনা মূল্যে ওকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।”

স্ট্রোকটনের ভাষ্যমতে, নূর কবির খুব বিনয়ী এবং বিরল প্রতিভা।”

প্রথম রোহিঙ্গা হিসেবে বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতা আইসিএন ক্লাসিক বিজয়ী হয়ে গর্বিত নূর কবির বলেন, “শরণার্থী ব্যাকগ্রাউন্ডই আমার শক্তি। যে লড়াইটা আমি ক্যাম্পে করেছি, সেটা এখন করছি অনুশীলনে। রোহিঙ্গাদের জন্য আমার এই লড়াই।”

তিনি আরও বলেন, ” শুধু অস্ট্রেলিয়ায় নয়, সারা বিশ্বে আমি প্রতিযোগিতা করে আমার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।”

বর্তমানে তিনি পুষ্টিবিদ হওয়ার জন্য পড়াশোনা করছেন। তিনি মনে করেন খেলাধুলার প্রতি তার যে আত্মনিয়োগ তা অন্য শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করবে। যে পরিস্থিতিতেই থাকুক না কেন তারা নিজেদের সুস্বাস্থ্য ধরে রাখবেন।

সুত্র : ঢাকা ট্রিবিউন

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *