পথ দেখাচ্ছেন গবেষকেরা

নেতারা যেখানে ব্যর্থ, সেখানে পথ দেখাচ্ছেন গবেষকেরা

নতুন করোনাভাইরাস শুধু এর প্রকরণ, বিস্তার ও সঞ্চারিত আতঙ্কের দিক থেকেই অভিনব নয়;আরও নানা নতুন বাস্তবতা এটি সামনে এনে হাজির করেছে। এই মহাসংকটই একমাত্র দেখিয়ে দিয়েছে যে এত দিনকার বিশ্বব্যবস্থায় রাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কতটা ব্যর্থ। বৈশ্বিক এ মহামারির বিষয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশেষ কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি। ভাগ্যিস বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল এবং এগুলো এখনো মরে যায়নি। এই সংকটে দৃষ্টিগ্রাহ্য হওয়া শূন্যতা পূরণে এখন সবচেয়ে অগ্রসর ভূমিকা রাখছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যে কী মাত্রায় ফাঁপা, তা করোনাভাইরাসের সংকট প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭) এই সংকটকালে এমনকি একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার বিষয়েও একমত হতে পারেনি। অথচ এই জোটে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মতো ধনী ও ক্ষমতাশালী দেশ। এই ব্যর্থতার পর তাকানো হয়েছিল ধনী দেশগুলোর জোট জি-২০-এর দিকে। কিন্তু এই জোটও সংকটটিকে ‘বৈশ্বিক’ ও ‘গুরুতর’ ঘোষণা দেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুতেই একমত হতে পারেনি।

বাকি থাকল জাতিসংঘ। বৈশ্বিক এ সংস্থার মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানালেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এখনো বিষয়টিতে নীরব ভূমিকা পালন করছে বলা যায়। অথচ কোভিড-১৯–এর মতো রোগ তো কোনো সীমানা মানছে না, যদিও বিশ্বনেতারা এখনো নিজ নিজ সীমানা মেনেই বিভক্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বাদ দিলে আর কোনো বৈশ্বিক সংস্থাই প্রত্যাশিত সাড়া দেয়নি এ মহাদুর্যোগে। অথচ এই সংস্থাটিরই তহবিল দিনের পর দিন কমানো হয়েছে। শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরে কেন, এই একই অবস্থা দেখা যায় যেকোনো দেশের জাতীয় পর্যায়েও। দিনের পর দিন স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করা হয়। যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই খাতকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সেই সব নীতিপ্রণেতাদের দিকে, যাদের হয়তো এই খাত সম্পর্কে ভালো করে ধারণাই নেই। কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের তাকিয়ে থাকতে হয় অন্য কোনো বিভাগের দিকে। কারণ, নীতি প্রয়োগের সক্ষমতা ইচ্ছাকৃতভাবেই কমিয়ে রাখা হয়। অথচ আজকের এই সংকটে মানুষের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি নিচ্ছেন এই খাতের কর্মীরাই।

এই সংকট বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর ব্যর্থতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। গত বছরের শেষ দিকেই চীন থেকে একাধিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ দেশের সরকার বিষয়টিকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। ধারণা করা হয়, এর আগে সার্সের মতো নতুন করোনাভাইরাসও ছড়িয়েছে চীনের উহানের বন্য প্রাণীর বাজার কিংবা কোনো মাছ-মাংসের বাজার থেকে। শুরুতে এ ধরনের তথ্য দেওয়া হলেও না চীন, না অন্য কোনো দেশ এ বিষয়ে কোনো সতর্কতা নেয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানালেও বিশ্বনেতারা থোড়াই কেয়ার করেছেন। যে যার মানচিত্রে বসে শুধু নিজেদেরই রক্ষার ছক কষেছেন। ফল তো এখন হাতেনাতে—পুরো বিশ্বই সংক্রমিত ও আতঙ্কিত।

এই যখন বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অবস্থা, তখন এত দিন আড়ালে থাকা গবেষণা সংস্থাগুলো ঠিকই বৈশ্বিক আচরণ করেছে ও করছে। একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানী উঠেপড়ে লেগেছেন। যে যেই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করুন না কেন, তাঁরা তথ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা দিয়ে একে অন্যকে সহযোগিতা করছেন। বিভিন্ন দেশের প্রশাসন যখন সীমানায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে, নিজেদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ ঠিক রাখতে নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ, তখন স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে গবেষক মহলের এই আন্তর্জাতিক আচরণ সত্যিই আশাবাদী করে। আর এ ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে নেতৃত্বের আসনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকেরা সমবেত হয়েছেন সত্যিকারের এক আন্তর্জাতিক প্রয়াসে, যার মূল লক্ষ্য কোভিড-১৯–এর ওষুধ ও ভ্যাকসিন বের করা। দুর্যোগের এই সময়ে এই গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে আন্তযোগাযোগ ও নির্ভরশীলতা এমন মাত্রায় বেড়েছে যে এখন সেই তথাকথিত ‘একাডেমিক ক্রেডিট’ কথাটিকে নিছক মিথ মনে হতে পারে। নিত্যনতুন পন্থায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে তথ্য ভাগ করে নিচ্ছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনার ইনস্টিটিউটের গবেষক দলের কথা, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সারাহ গিলবার্ট। এই দলের পরিচালিত গবেষণার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ যুক্ত। গত জানুয়ারি থেকেই অক্সফোর্ডের এই গবেষক দল কাজ করছে চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সেস ও চাইনিজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সঙ্গে। মার্কিন পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্স জানাচ্ছে, সারাহ গিলবার্টের দলের তৈরি করা ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগটি প্রাণিদেহে করছে যুক্তরাষ্ট্রের রকি মাউন্টেন ল্যাবরেটরিজ ও অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন। ভ্যাকসিনটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে বড় পরিসরে এর উৎপাদনের দায়িত্ব পড়তে পারে ভারত, চীন ও ইতালির ওপর।

এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশগুলোও। সরকারগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে এক দেশের গবেষক অন্য দেশের গবেষকদের সহায়তা করছেন। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো কোভিড-১৯-এর চিকিৎসাপদ্ধতি বা টিকা আবিষ্কারে বিনিয়োগ করতে না পারলেও তাদের গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য দিয়ে উন্নত বিশ্বের অর্থায়নে চলা গবেষণা প্রকল্পগুলোকে সহায়তা দিচ্ছেন।

এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে ও হচ্ছে, তার কোনোটিই দরিদ্র কোনো দেশে হয়নি। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, করোনাভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সঙ্গে সঙ্গে এখন পর্যন্ত যে চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো কিছুটা হলেও কার্যকারিতা দেখিয়েছে, সেগুলো দরিদ্র দেশের মানুষের জন্যও উন্মুক্ত করা জরুরি। সব মিলিয়ে এই দুর্যোগে বিশ্বনেতারা সঠিক পথটি দেখাতে না পারলেও সব সময় আড়ালে থাকা গবেষক, বিজ্ঞানীরা এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই পথপ্রদর্শনের দায়িত্বটি নিয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও গবেষণায় যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়ে যে আন্তর্জাতিকতার স্বাক্ষর রাখছেন, তা ভবিষ্যতের বিশ্বকাঠামোয় এ সম্পর্কিত সত্যিকারের একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দাবি জানাচ্ছে।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *