চীন কি জিতে যাচ্ছে !!!

বছরের শুরুটা চীনের জন্য ছিল ভয়াবহ। উহানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথমে সবকিছু চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। অনেকে আবার একে চীনের ‘চেরনোবিল’ হিসেবে আখ্যা দেন, অর্থাৎ চেরনোবিলে পারমাণবিক দুর্ঘটনা যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ত্বরান্বিত করেছিল, এটিও চীনের বেলায় তা-ই করবে। প্রথম দিকে কিছু ভুলচুক করার পর চীনা সরকার দ্রুতই অভূতপূর্ব লকডাউন শুরু করে। এতে কাজ হয়েছে বলেই মনে হয়। নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার হার একেবারেই কমে গেছে। দেশটির কলকারখানা খুলতে শুরু করেছে। গবেষকেরা টিকার পরীক্ষামূলক ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে এই রোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। দেখা গেল, চীনে এই রোগের প্রকোপ শুরু হলেও মৃত্যুর সংখ্যায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

চীন এটিকে বিজয় হিসেবেই দেখছে। দেশটির বিপুলাকার প্রচারযন্ত্র প্রচার চালাচ্ছে যে চীন এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে, আর তার কৃতিত্ব দেশটির একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রাপ্য। এখন আবার দেশটি বলছে, সারা পৃথিবীতে মেডিকেল কিটসহ চিকিৎসাসামগ্রী পাঠিয়ে তারা উদারতার পরিচয় দিচ্ছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের মধ্যভাগ পর্যন্ত ৪০০ কোটি মাস্ক তারা রপ্তানি করেছে। তারা যে আত্মত্যাগ করেছে, তাতে বাকি পৃথিবী প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি এই সুযোগ অপচয় করে থাকে, তাহলে সেটা তাদের ব্যর্থতা।

পশ্চিমের ভয়াতুর পররাষ্ট্রনীতির পর্যবেক্ষকেরাসহ অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, চীন এই বিপর্যয় থেকে জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসবে। তাঁরা সতর্কবাণী দিচ্ছেন, এই দুর্যোগ কেবল মানবিক বিপর্যয় হিসেবেই আখ্যায়িত হবে না, ভূরাজনৈতিক ভরকেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবেও চিহ্নিত হবে, যাকে বলে যুগসন্ধি।

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা স্বাভাবিক কারণেই গৃহীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ব্যাপারে নেতৃত্ব দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আছে বলে মনে হয় না। অথচ আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এইচআইভি/ইবোলাবিরোধী বৈশ্বিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর ট্রাম্প এর মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডব্লিউএইচও) তহবিল দেওয়া বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ হচ্ছে, ডব্লিউএইচও চীনের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করে। ব্যাপারটা হলো, হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প একদিকে ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা’ দাবি করবেন আবার অন্যদিকে বলবেন, ‘আমি মোটেও দায়িত্ব নেব না’; এই পরিস্থিতি তো চীনের সামনে অবারিত সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে নিজের প্রভাব আরও বিস্তার করার।

তবে এটি সফল না-ও হতে পারে। কারণটা হলো, চীন যে রকমটা দাবি করছে তার সফলতা প্রকৃত অর্থেই সে রকম কি না, তা জানার উপায় নেই। আর দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো তারা এত ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে কি না, তা বলা তো আরও কঠিন। চীনের সরকারি কর্মকর্তারা প্রকৃত তথ্য দিচ্ছেন কি না, তা বলা বাইরের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার জোর করে কারখানা খোলা রাখতে পারে, কিন্তু জোর করে তো মানুষকে দিয়ে পণ্য কেনাতে পারে না। যত দিন এই মহামারি বিপর্যয় ঘটাবে, তত দিন এটা বলা মুশকিল হবে, চীনের এই রোগ লুকোছাপা করার জন্য মানুষ কি তাদের বাহবা দেবে, নাকি যে চিকিৎসক উহানে প্রথম এই রোগের কথা বলেছিলেন, তাকে দমানোর জন্য চীনকে দোষারোপ করবে।

ধনী দেশগুলো আবার চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা বিভাগের প্রধান মার্গারেট ভেস্টাজের ইউরোপীয় সরকারগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারি কিনে রাখে। তা না হলে চীন এই দুরবস্থার মধ্যে সস্তায় ওই সব প্রতিষ্ঠানের অংশীদারি কিনে নেবে। আরও বৃহৎ পরিসরে বললে, মহামারির মধ্যে এই যুক্তি সৃষ্টি হয়েছে, যেকোনো দেশের পক্ষে এখন আর গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবার জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না, তা সে ভেন্টিলেটর হোক বা ৫-জি প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক হোক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ধারণা, বিশ্ব বাণিজ্য স্বল্প মেয়াদে ১৩ থেকে ৩২ শতাংশ হ্রাস পাবে। আর এটা যদি দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্বায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপার হয়, তাহলে অন্য সবার মতো চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যদিও এই সংকট কোভিড-১৯-এর আগেই শুরু হয়েছে।

তবে আরও মূল কথা হলো, অন্যান্য দেশ চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে দেখতে চায় কি না, তা নয়; চীন নিজে তা চায় কি না, সেটা। নিশ্চিতভাবেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা আত্মস্থ করার চেষ্টা করবে না, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো সহযোগীদের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা, কূটনৈতিক ক্ষমতা থেকে শুরু করে গুগল, হার্ভার্ড ও গেটস ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের সব সংকটে যেমন যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়েছে—চীন সে রকম কিছু চাইছে না।

কোভিড-১৯-এর টিকা উদ্ভাবনে চীন কী ভূমিকা পালন করে, সেখান থেকে তার উচ্চাশার ধরন বোঝা যাবে। তারা দ্রুত টিকা উদ্ভাবন করতে পারলে সেই সফলতা জাতীয় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর বৈশ্বিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হবে সেটা। আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে, গরিব দেশগুলোর ঋণ মওকুফে সে কী ভূমিকা পালন করে। ১৫ এপ্রিল চীনসহ জি-২০ ভুক্ত দেশগুলো ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ আট মাসের জন্য স্থগিত করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আগে চীন সাধারণত ঋণ নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করত, রাজনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির জন্য দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা করত। জি-২০-এর এই সিদ্ধান্তের অর্থ যদি এই হয় যে চীন অন্য ঋণদাতাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে যেতে চায় এবং আরও উদার হতে চায়, তাহলে বোঝা যাবে, নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে সে আরও টাকা খরচ করতে রাজি।

ব্যাপারটা হলো, নেতৃত্ব নেওয়ার ব্যাপারে চীন যত না আগ্রহী, তারে চেয়ে বেশি আগ্রহী এটা নিশ্চিত করতে যে অন্য কেউ যেন তাতে হাত দিতে না পারে। আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে সে ডলারের অবস্থান দুর্বল করে দিতে চায়। পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থায় চীন নিজেদের কূটনীতিকদের বসানোর চেষ্টা করছে। লক্ষ্য পরিষ্কার, মানবাধিকার ও ইন্টারনেট পরিচালনা ব্যবস্থার বৈশ্বিক নিয়ম প্রণয়নে তাদের প্রভাব নিশ্চিত করা। এখন ট্রাম্প যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন, তাতে চীন নিজের জাত চেনানোর সুযোগ পেয়ে গেল।

চীনা নেতাদের উচ্চাশা আছে। একই সঙ্গে তাঁরা আবার সতর্ক, কারণ ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল দেশ শাসন করতে হয় তাঁদের। তাঁদের একদম শূন্য থেকে নিয়মতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে না। তাঁরা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ব্যবস্থার টলায়মান ভিত্তিগুলো ঠেলতে ঠেলতে এটা নিশ্চিত করতে চাইবে যে তার উত্থান যেন অবাধ হয়।

ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। মহামারি মোকাবিলা করতে হবে বৈশ্বিকভাবে, ঠিক যেমন জলবায়ু পরিবর্তন ও সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলা করতে হয়। পরাশক্তিগুলো স্বার্থপর হলে কী ঘটে, ১৯২০-এর দশকে আমরা তা দেখেছি। তারা তখন অন্যের অসুবিধার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কোভিড-১৯ যতটুকু দূরদর্শী মহানুভবতা সৃষ্টি করেছে, ঠিক ততটাই সুবিধা লাভের জন্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। আজকের পরিস্থিতির পেছনে ট্রাম্পের দায় আছে ঠিক, কিন্তু চীনও যদি পরাশক্তির মতো শীতল আচরণ করে, তাহলে ব্যাপারটা বিজয় নয়, হবে বিয়োগান্ত ঘটনা।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *