চট্টগ্রামে করোনার উপসর্গে মৃত্যু ৫ গুণ বেশি

চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক শোয়াইবুল করিমের বাবা আবু বকর ছিদ্দিকও একজন চিকিৎসক ছিলেন। ৮ জুন করোনার উপসর্গ নিয়ে তিনি মা ও শিশু হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর আগে তাঁর করোনা পরীক্ষা করা হলে রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। তবে মৃত্যুর পর পুনরায় নমুনা পরীক্ষা করা হলে ১২ জুন পজিটিভ আসে। কিন্তু করোনায় মৃত চিকিৎসক বা ব্যক্তিদের তালিকায় আবু বকর ছিদ্দিকের নাম নেই।

ছেলে শোয়াইবুল করিমের ধারণা, তাঁর বাবার প্রথম রিপোর্ট ছিল ‘ফলস নেগেটিভ।’ তিনি তাঁর বাবার মৃত্যু করোনায় হয়েছে, এটা লিপিবদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

চট্টগ্রামে কোভিড রোগে মৃত্যুর চেয়ে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ গুণ বেশি। এখানকার দুটি হাসপাতালের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর পর বেশির ভাগ মৃতদেহ থেকে নমুনা নেওয়া হচ্ছে না। নিউমোনিয়া বা অন্য কোনো রোগে মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এরপর স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে লাশ।

এতে করোনায় মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কোভিড হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গত ৩ এপ্রিল থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ৪০ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মারা যান ৩১ জন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিসংখ্যান একেবারেই চমকে ওঠার মতো। এই হাসপাতালের কোভিড হলুদ জোনে (উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন) ৪ এপ্রিল থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৭ জন শ্বাসকষ্টের রোগী ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে মারা যান ৩২৯ জন। অন্যদিকে এই হাসপাতালের কোভিড লাল জোনে ২১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ১৯০ জন কোভিড রোগী ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে মারা যান ২৪ জন। অর্থাৎ দুই হাসপাতালে কোভিডে মারা গেছেন ৬৪ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৬০ জন। চমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন এবং জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট মো. আবদুর রব মৃত্যুর তথ্য এই প্রতিবেদককে দিয়েছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গতকাল সোমবার ভোর ছয়টা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮০ জন রোগী শনাক্ত হন। তাঁদের মধ্যে কোভিডে রোগে চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ৫টি হাসপাতালে মারা যান ১৪৪ জন। মৃত্যুর হার ২ দশমিক ২৪ শতাংশ। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন ৬৯১ জন এবং বাসায় সুস্থ হন ২ হাজার ৫০৫ জন। উপসর্গে মৃত্যুর কোনো হিসাব সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল ও জেনারেল হাসপাতালে কোভিডে মারা গেছেন ৬৪ জন। আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৬০ জনের।

চট্টগ্রামে কোভিড রোগী প্রথম শনাক্ত হন ৩ এপ্রিল। সেদিন থেকে জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা শুরু হয়। করোনায় আক্রান্ত বা উপসর্গ বাড়তে থাকায় চমেক হাসপাতালে খোলা হয় ‘কোভিড হলুদ জোন’। সেখানে শনাক্তহীন তথা শ্বাসকষ্টের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ২১ মে থেকে কোভিড রোগীদের জন্য খোলা হয় লাল জোন। শনাক্ত হওয়া কোভিড রোগীদের সেখানে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘উপসর্গে মৃত্যুর পরও দু-একটি ‘পজিটিভ কেস’ আমরা পেয়েছি। আর বাসাবাড়িতে কেউ মারা গেলে সেটা হয়তো পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। আমরাও ওই রোগীকে কোভিড বলতে পারি না।’

তবে চমেকের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি চিকিৎসা গাইডলাইনে কোভিডজনিত মৃত্যুর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে সন্দেহজনক করোনা রোগী হিসেবে চিকিৎসা পাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুকে কোভিড রোগে মৃত্যু বলে ধরে নিতে হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী মনে করেন, চট্টগ্রামে কোভিড রোগীর প্রকৃত সংখ্যা শনাক্তের চেয়ে ২০ থেকে ২৫ গুণ বেশি হবে। তিনি বলেন, ‘উপসর্গ নিয়ে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এতে করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর আসল চিত্র উঠে আসছে না। নমুনা পরীক্ষার স্বল্পতার কারণে এক বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে আমরা আছি।’ তিনি উপসর্গ থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির করোনার নমুনা পরীক্ষা করা দরকার বলে অভিমত দেন।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published.