গীবত বা পরনিন্দা : সামাজিক প্রভাব

গীবত বা পরনিন্দা অর্থ বিনা প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির দোষ অপরের নিকটে উল্লেখ করা।কোন মানুষের এমন কিছু বিষয় যা তার অনুপস্থিতিতে উল্লেখ করা, যা সে অপছন্দ করে, যদিও তা তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে।গীবত বা পরনিন্দা সামাজিক শান্তি বিধ্বংসী একটি ঘৃণ্য অপরাধ।গীবত বাচনিক অথবা লেখনীর মাধ্যমে অথবা অঙ্গ-প্রতঙ্গের ইশারা ইঙ্গিতে কিংবা অন্য যে কোন উপায়েই বর্ণনা করা হোক এবং সে ব্যক্তি মুসলমান অথবা অমুসলিম হোক সর্বাবস্থায় গীবত ঘৃণ্য কাজ।হযরত আবূ হুরাইয়া (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! গীবত কি? তিনি বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে তোমার এমন আলোচনা যা সে অপছন্দ করে। প্রশ্নকারী বলল, আমি যা বলি তা যদি বাস্তবিকই তার মধ্যে থাকে, তাহলে আপনার কি মত? তিনি বললেন, তুমি যা বল তা যদি বাস্তবিকই তার মধ্যে থেকে থাকে তবেই তা তার গীবত করলে। তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থেকে থাকে তবে তুমি তাকে মিথ্যা অপবাদ (বুহতান) দিলে [দ. তিরমিযী, বিরর ওয়াসসিলাহক অধ্যায়] বলে।

সমাজে যেসব বিষয়ে ফাটল ধরাতে এবং ঐক্যের সুরম্য প্রাসাদকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিতে সক্ষম এমন বিষয়গুলির অন্যতম হল পরনিন্দা বা গীবত। এর মাধ্যমেই শয়তান সমাজে ফাটল ধরিয়ে থাকে। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ “পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ।” [সূরা হুমাযাহ:০১] কুরআন ও হাদিসে এই আচরণ সম্পর্কে বিভিন্নভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

গীবত কবীরা গুনাহ্‌র অন্তর্ভুক্ত। গীবতের পাপ সুদ অপেক্ষা বড়; বরং হাদিসে গীবতকে বড় সুদ বলা হয়েছে (সহীহ আত্‌ তারগীব) রাসূলুল্লাহ্‌ (সা:)-এর নিকটে আয়েশা (রা) ছাফিইয়া (রা:)-এর সমালোচনা করতে গিয়ে বলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা:)! আপনার জন্য ছাফিইয়ার এরকম এরকম হওয়াই যথেষ্ট। এর দ্বারা তিনি ছাফিইয়ার বেঁটে সাইজ বুঝাতে চেয়েছিলেন। এতদশ্রবণে নাবী কারীম (সা:) বললেনঃ “হে আয়েশা! তুমি এমন কথা বললে, যদি তা সাগরের পানির সঙ্গে মিশানো যেত তবে তার রং তা বদলে দিত।”
আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ “তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে, তোমাদের কেউ কি চায় যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই করে থাকো।” [সূরা হুজুরাত:১২] অত্র আয়াত প্রমাণ করে যে, গীবত করা মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ করার শামিল।

বর্তমানকালে এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে কম-বেশী গীবত বা পরচর্চা হয় না। অবশ্য যারা এই পরচর্চায় জড়িত তাদের কাছে গীবতের সংজ্ঞা একটু ভিন্নতর। যেমন তাদের মতে কারো এমন কোন দোষ বর্ণনা করাকে গীবত বলে- যা তার সামনে বলা সম্ভব নয়। অতএব, সামনে বর্ণনা করা যায় এমন দোষ- ত্রুটি বলাবলি করলে গীবত হবে না। অথচ রাসূলের হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, কারো সামনে বলার মত দোষ হোক কিংবা নাই হোক উভয় প্রকার দোষ-ত্রুটির চর্চাই গীবতের শামিল। সমাজের কিছু লোক একথাও বলে যে, কারো মধ্যে যে দোষ নেই তাকে সেই দোষে দোষী করাকে গীবত বলে। কিন্তু যে দোষ প্রকৃতপক্ষে তার মধ্যে আছে তা বর্ণনা করলে গীবত হবে না। তাদের এ ধারণাটিও অমূলক। কেননা উপরের সংজ্ঞা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, দোষ বর্ণনা করা হচ্ছে তা যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে না থাকে তবে তা বুহতান (অপবাদ) আর তা গীবতের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। আজকের সমাজের অন্য এক শ্রেণীর লোকের মতে যে দোষটি অন্যের জানা নেই, সে ধরণের দোষ বর্ণনা করা গীবত।
মহান আল্লাহ্তায়ালা আমাদেরকে হিংসা, পরনিন্দা, গীবতের মতো খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য পবিত্র কুরআনে একাধিক বা তাগিদ দিয়েছেন। আসুন আমরা সকলে হিংসা, পরনিন্দার মতো পাপ কাজ পরিত্যাগ করে সুখী সুন্দর ইসলামী সমাজ গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হই।

Categories:মতামত
Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *