খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর

দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও এড়াতে পারলেন না সাজা ।। সকল খুনিকে এনে রায় কার্যকর করা হবে : আইনমন্ত্রী

দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও সাজা এড়াতে পারলেন না আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবদুল মাজেদ। সাড়ে চার দশক আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গতকাল শনিবার প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ১২টা ১ মিনিটে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জেলার মাহবুবুল ইসলাম এই তথ্য জানান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে ছয় আসামি পলাতক ছিলেন, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মাজেদ তাদেরই একজন। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অন্য খুনিদের মতো মাজেদও পুরস্কার হিসেবে সরকারি চাকরিতে উঁচু পদ পেয়েছিলেন। খবর বিডিনিউজ, বাংলানিউজ ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।


গত রাত ১২টার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আমরা রায় কার্যকর করতে পেরেছি। তিনি বলেন, এটা আমাদের জন্য স্বস্তির। পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধুর সকল খুনিকে এনে রায় কার্যকর করা হবে। তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয়, জনগণের কাছে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি ছিল সেটা রক্ষা করা হয়েছে। এদিকে, ফাঁকি কার্যকরের আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ফটকে জোরদার করা হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। একইসঙ্গে রয়েছেন কারারক্ষীরাও। এর আগে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে কারাগারে পৌঁছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা। রাত সোয়া ১০টার দিকে ঢাকার সিভিল সার্জন পৌঁছেন কারাগারে। এরপর ১০টা ৪৭ মিনিটে পৌঁছেন জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
সূত্র জানায়, ফাঁসির আগে ইমামের কাছে তওবা পড়ার সময় চিৎকার করে কান্নাকাটি করেন। তবে ফাঁসি কার্যকরের সময় নিশ্চুপ ছিলেন মাজেদ। ফাঁসির আগ মুহূর্ত ও ফাঁসি কার্যকরের সময় সামান্য শব্দ করেননি তিনি। জানা গেছে, লাশ নেয়ার জন্য মাজেদের স্বজনরা কারাগারের বাইরে অপেক্ষা করছেন। মাজেদকে দাফন করা হবে তার জন্মস্থান ভোলায়। তাকে বহনের জন্য কারাগারের সামনে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর বিচারের পথ খুললেও দুই দশকের বেশি সময় ভারতে পালিয়ে থেকে বিচার এড়ান মাজেদ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৭ এপ্রিল ভোরে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৭২ বছর বয়সী মাজেদকে। দীর্ঘদিন পলাতক থেকে আপিলের সুযোগ হারানো মাজেদ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করলে তা-ও খারিজ হয়ে যায়।


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের ভাষায়, বঙ্গবন্ধুর এই পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারার বিষয়টি মুজিববর্ষে জাতির জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। এ বছরই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে বাংলাদেশ, যার সমাপ্তি ঘটবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে।
১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল হলে ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাই কোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাই কোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কার্যকর হয়। রায় কার্যকরের আগে ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আসামি আজিজ পাশা। মাজেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বর্তমানে পলাতক আসামি আছেন পাঁচজন। তারা হলেন খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, এসএইচ এমবি নূর চৌধুরী, এএম রাশেদ চৌধুরী ও মোসলেম উদ্দিন।
লাশ ভোলায় না পাঠানোর দাবি : বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্ত ক্যাপ্টেন মাজেদের লাশ ভোলায় না পাঠানোর জন্য দাবি জানিয়েছেন ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। গতকাল বিকালে তার নির্বাচনী এলাকা লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এ দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রয়োজনে এই ঘৃণ্য খুনির লাশ বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হোক।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *