করোনা সংকট নিয়ে জার্মান প্রবীণদের ভাবনা

ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে করোনাভাইরাস, আর সে ঝুঁকি প্রবীণদের জন্য অনেক বেশি৷ করোনা সংকট নিয়ে জার্মান প্রবীণরা কী ভাবছেন, এ বিষয়ে কতটা সতর্ক তাঁরা?আমার প্রতিবেশিদের মধ্যে অনেকেই প্রবীণ, তাদের বেশিরভাগই এই এলাকায় অনেক বছর ধরে নিজেদের বাড়িতে আছেন৷ সুখে দুঃখে সবাই সবার খোঁজ খবর রাখে৷ শুধু শীতের মাসগুলো ছাড়া নিয়মিত দেখা হয় এদের ঘরে কিংবা বাগানের কফির টেবিলে, ওয়াইনের আড্ডায়৷

ওদের আড্ডার জন্য এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও করোনার কারণে অনুকূল নয় সময়৷ ঘরবন্দি হয়ে কী করছেন তাঁরা? কি ভাবছেন করোনা নিয়ে? তাঁরা কি ভয় পাচ্ছেন?
না, ভয়ের কিছু নেই, ভয় মানুষকে আরো বেশি অসুস্থ করে তোলে তবে খুবই সাবধান থাকতে হবে সবাইকে৷” বললেন আমার প্রতিবেশি ডা. হর্স্ট লিংকার৷ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে একা আছেন তিনি৷ তবে কেনাকাটা বা অন্য কাজে সাহায্য করার লোক রয়েছে৷ ডা. লিংকার আরো বললো, এ সময়ে যারা কর্মস্থলে যায় তাদের মাস্ক এবং হ্যান্ড গ্লাভস অবশ্যই পড়তে হবে, একই ঘরে সহকর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে৷ শরীর গরম রাখা এবং যথেষ্ট পানি ও তরল পান করাও খুব জরুরি৷ কোলন বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত এই ডাক্তার টেলিফোনে জানালেন, তাঁর পরিচিত অনেকেই বৃদ্ধাশ্রমে আছেন, সেখানে প্রবীণরা একসাথে থাকার কারণে খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যাচ্ছে করোনার ভাইরাস৷ আর সেখানে প্রবীণদের দেখাশোনা করে যারা তারও দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে- এটা একটি বড় সমস্যা বলেও উল্লেখ করলেন হর্স্ট৷
৮২ বছর বয়সি এই ডাক্তারের কিছুটা শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও মানসিকভাবে শতভাগই ফিট৷ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে৷ এমনিতেই এই ডাক্তার অ্যাকোর্ডিয়ান বাজান, গান গান, ভালো ছবিও আঁকেন৷ তারই উদ্যোগে গত ২৯মার্চ আন্তর্জাতিক কবিতা পাঠের কথা ছিল, যেখানে আরো নয়টি ভাষার কবিতার সঙ্গে পড়া হতো রবীন্দ্রনাথও৷ স্বাভাবিকভাবে করোনার কারণে আয়োজনটি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ ডাক্তার সাহেব ফোন রাখার আগে আমাকে আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন সেকথা৷ জীবনে সুস্থভাবে বেচে থাকার জন্য শরীর এবং মনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে- পরিস্থিতি বা পরিবেশ যেমনই থাকুক না কেন৷ জীবনের হাজারো মানুষের সংস্পর্শে আসা অভিজ্ঞ মানুষটির এই কথাটি আমার সবসময়ই খুব ভালো লাগে৷
জার্মানিতে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর সুপারশপ ও খাবারের দোকানগুলোতে লম্বা লাইন ধরে লোকজন নিত্যপণ্য কেনা শুরু করে৷ টিনজাত খাবার এবং টয়লেট পেপারের তাক তো খালিই থাকছে৷ এ অবস্থায় দেশটিতে দরিদ্রদের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে৷ অথচ দেশটিতে ১৫ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভরশীল৷
করোনা নিয়ে প্রবীণদের ভাবনা জানতে এবার ফোন করলাম মারিয়ানে টপহোফেনকে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক৷ খুবই মিষ্টি ব্যবহার তবে কেন যেন আমার মনে হয় টিচার হিসেবে ও বেশ কড়া ছিলো৷ তবে করোনা ভাইরাস নিয়ে মারিয়ানের বক্তব্য এমন, করোনা ভাইরাস রোগটি সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি, এর কোনো প্রতিষেধকও নেই৷ এই মুহূর্তে করোনার একমাত্র ওষুধ খুব সাবধানে থেকে মাথা ঠান্ডা রাখা এবং নিয়মিত মুক্ত বাতাসে হাঁটতে যাওয়া৷
এরই মধ্যে আমরা অনেকেই জানি যে করোনার কারণে অনেক মা-বাবা হোম অফিস করছে এবং সন্তানরাও বাড়িতে, ফলে পরিবারে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা, এ সম্পর্কে মারিয়ানে বললো, এই সমস্যাকে এত বড় করে দেখার কিছু নেই৷ সবার জন্য সারাদিনের একটি রুটিন তৈরি করে , যার যার কাজ ভাগ করে দিলে অনেক সহজেই এর সমাধান সম্ভব৷ এই পরিস্থিত চিরদিন থাকবেনা, তাই সকলেরই ভাবা উচিত, মানুষের যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে আসার এবার একটা সুযোগ হয়েছে৷ পেশাগত জীবনে মারিয়ানে বহু পরিবারকে দেখেছে, পারিবারিক সমস্যা মিটিয়েছে অনেকের৷মারিয়ানের পরামর্শ, সবাই মিলে পুরনো দিনের গল্প করুন, পুরনো ছবি দেখুন কিংবা ইনডোর গেম খেলে সময় কাটান৷ এসবের মধ্যদিয়েই কিন্তু পারিবারিক বন্ধন গভীরতা পায়৷ গত আড়াই সপ্তাহে এই শিক্ষক মাত্র একবার বাইরে গেছেন, তাও আবার ব্যাংকের কাজে৷ তবে টুকটাক কেনাকাটায় তাকে আরেক প্রতিবেশি সাহায্য করছেন৷
টেলিফোনের ডিসপ্লেতে আমার নাম্বার দেখেই হেলগা ক্যোসলিং আদুরে গলায় হ্যালো বলে উঠলো, আমাকে হ্যালো বলার সুযোগ না দিয়েই বলতে শুরু করলো, তোমার বাসা থেকে যে কালিজিরা চাল এনেছি সেটা দিয়ে আগামীকাল তোমার মতো করে পোলাও রান্না করবো৷ পোলাও খাওয়া পরে হবে বলে ওকে থামিয়ে দিয়ে, করোনা সম্পর্কে ওর মতামত জানতে চাইলাম৷ ফোনের ওপাশ থেকে ওর উত্তর, এ বিষয়ে সবচেয়ে জরুরি হাইজিন বা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা৷ আগে থেকে অ্যাপয়েনমেন্ট থাকায় আমি আজ ফিজিও থেরাপিস্টের কাছে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মাস্ক আর গ্লাভস পড়ে৷ আর হ্যাঁ, শরীররের ইমিউন সিস্টেম ঠিক রাখার জন্য ভিটামিন যুক্ত খাবার খেতে হবে অবশ্যই৷ বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের আশেপাশের মানুষদের সাথে দেখা না হলেও কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই হেলগা করোনা বিষয়ক কোনো না কোনো ভিডিও পোস্ট করে সবার সাথে যোগাযোগ রাখছে প্রতিবেশিদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে৷
১২ জন প্রতিবেশি পরিবার নিয়ে একটি গ্রুপ রয়েছে আমাদের৷ এদের মধ্যে যার জন্মদিন থাকে তার বাড়ির সামনে সকাল এগারোটায় অন্যরা সমবেত হয়ে জন্মদিনের গান গেয়ে সে দিনের বিশেষ মানুষটিকে শুভেচ্ছা জানায়৷ আর প্রত্যেকেরই হাতে থাকে হয় ফুল না হয় ওয়াইনের বোতল, এই রীতিটি আমি গত ১০ বছর যাবতই দেখছি, কিন্তু এবার এর ব্যাতিক্রম ঘটিয়েছে করোনা ভাইরাস৷
সবচেয়ে বয়স্ক প্রতিবেশি হুবার্ট বেকারের কয়েকদিন আগে ৮৮ তম জন্মদিন ছিলো ৷ এবার কেউ তাঁকে গান গেয়ে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা জানাতে যায়নি, করোনা নামের ভয়ঙ্কর ভাইরাস দেয়ালটির জন্য৷ হুবার্টের জন্য সেদিন আমার সত্যিই খুব খারাপ লেগেছিলো৷
আমাদের উল্টোদিকের বাড়ির মালিক রিটা এবং জো জুন্ডাকেম্পার৷ সপ্তাহে অন্তত দুইদিন সাজগোজ করে ডিনার করতে যায় বাইরে, যা এখন একেবারেই বন্ধ রেখেছে ওরা৷প্রতিদিন রান্না করতে হচ্ছে বলে রিটার মন কিছুটা খারাপ হলেও সে বললো, যত কষ্টই হোক এখন বাসায়ই খেতে হবে৷ তাছাড়া বাসার কাজে সাহায্য করার মেয়েটিকেও আসতে না করে দিয়েছি৷ আমাদের মেয়ে বন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার করে দিয়ে যায়, ওর নির্দেশে আমাদের এখন বাইরে যাওয়া একেবারেই বন্ধ৷
মুশকিল হয়েছে জো-র জন্য, বাঙালিদের মতো মানুষ ছাড়া থাকতে পারেন না তিনি৷ কদিন থেকে দেখছি বাড়ির সামনের বাগানে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই আমাদের দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন, যদি বাইরে বের হই, একটু গল্প করতে পারবে সে আশায়৷ আমার একটু মায়াই হচ্ছিলো ওর জন্য৷ বেচারা জো! ৮৫ বছর বয়সি কর্মঠ মানুষটি ভেবে পাচ্ছেন না কী করে সময় কাটাবে৷
ওদের কয়েকটি ছোটছোট ফ্ল্যাট রয়েছে , সেগুলোতে অল্প আয়ের মানুষরা ভাড়া থাকে৷ করোনা সংকটকালীন সময়ে ভাড়াটিয়াদের কেউ কেউ হয়তো সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করতে অক্ষম কিন্তু এ নিয়ে জুন্ডাকেম্পার দম্পতির কোনো আক্ষেপ নেই, বরং বলছিলো, ভয়ঙ্কর এই পরিস্থিতিতে ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ভাড়াটিয়ারা সুস্থ থাকুক এটাই বড় কথা, করোনা যুদ্ধ থেমে গেলে সবই আবার ঠিক হয়ে যাবে৷
এদের সাথে করোনা বিষয়ে কথা বলে আমার শুধু মনে হয়েছে, যে কোনো বড় সংকটে মানুষের প্রয়োজন একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো আর পরিস্থিতি আয়ত্বে আনার জন্য সকলের সম্ভাব্য চেষ্টা করা৷তবেই কেবল করোনার মতো বড় কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব! সূত্রঃ ডয়চে ভেলে।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *