করোনায় আক্রান্ত চট্টগ্রামের প্রথম মৃত্যু সাতকানিয়ায়

সাতকানিয়ায় ৩৪২ পরিবার লকডাউন

চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে করোনা পজেটিভ এসেছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে এটিই প্রথম মৃত্যু। গতকাল শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নূর এ আলম।
জানা যায়-সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ইছামতি আলীনগর এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজুল ইসলাম (৬৫) নামের ওই ব্যক্তি মারা যান। মৃত্যুর দিন রাতে চমেক হাসপাতালে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) হতে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, খবরটি সাতকানিয়া এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিরাজুল ইসলামের মৃত্যু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গতকাল রাত সাড়ে ১১টার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডটি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর এ আলম, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ওসমানী ও সাতকানিয়া থানার ওসি মো. সফিউল কবীর এলাকায় উপস্থিত হয়ে লোকজনের সাথে কথা বলার পর ইছামতি আলীনগরের পুরো ওয়ার্ডটি লকডাউনের বিষয়টি মাইকে প্রচার করেন এবং লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন। লকডাউনকৃত ওয়ার্ডে মোট ৩৪২টি পরিবার বসবাস করে বলে জানা গেছে।
সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য ফরমান আলী আজাদীকে জানান, ইছামতি আলীনগরের সোনাজানের বর বাড়ির মৃত এজাহার মিয়ার পুত্র সিরাজুল ইসলাম গত ৪ এপ্রিল (শনিবার) থেকে জ্বর, সর্দি কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। গত বুধবার রাতে চিকিৎসার জন্য তাকে কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে দেখানোর পর করোনার উপসর্গ থাকায় কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। ওইদিন রাতে তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরের দিন সকালে তার নমুনা সংগ্রহের জন্য তার পরিবারের লোকজনকে থাকতে বলা হয়। কিন্তু রোগীর সাথে থাকা লোকজন তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এনে রোগীকে অঙিজেন দেন তার পরিবারের সদস্যরা। সন্ধ্যার দিকে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের লোকজন স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক নুর মোহাম্মদকে ডেকে আনেন। পল্লী চিকিৎসক নুর মোহাম্মদ দেখার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপরও পরিবারের লোকজন তাকে পুনরায় কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রোগীর কোন সাড়া না পাওয়ায় তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাতে অ্যাম্বুলেন্সযোগে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই বৃদ্ধকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর চমেক হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের পর তার লাশ শুক্রবার ভোরে বাড়িতে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। পরে শুক্রবার সকালে জানাজা শেষে তার লাশ দাফন করা হয়।


কেরানীহাট আশশেফা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসাইন জাহেদ জানান, বুধবার রাতে সিরাজুল ইসলামের নামের বয়স্ক এক রোগীকে হাসপাতালে আনা হয়। আমি যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে থেকে জরুরি বিভাগে ওই রোগীকে দেখি। জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ করোনার উপসর্গ থাকায় রোগীর স্বজনদেরকে আমি তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দিই। শুনেছি তাকে জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ওসমানী জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিরাজুল ইসলামের মৃত্যু হওয়ার খবর পাওয়ার পর আমরা এলাকায় গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলেছি। পরে পশ্চিম ঢেমশার ৩নং ওয়ার্ডটি লকডাউন করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, কেরানীহাটে যে হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে সে হাসপাতালের চিকিৎসক, স্টাফ ও অ্যাম্বুলেন্সের চালকসহ রোগীর সংস্পর্শে আসা সবাইকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর এ আলম আজাদীকে জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে পুরো চট্টগ্রামের মধ্যে সাতকানিয়ার এটি প্রথম মৃত্যু। সিরাজুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আমরা এলাকায় গিয়ে পুরো একটি ওয়ার্ড লকডাউন করেছি। লকডাউনের বিষয়টি মাইকে প্রচার করে দিয়েছি। এ ওয়ার্ডে মোট ৩৪২টি পরিবারের বসবাস রয়েছে বলে জেনেছি। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত পুরো ওয়ার্ডের লোকজনকে বাইরে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে বাইরের লোকজনও যাতে ওই ওয়ার্ডে না ঢুকে সেই বিষয়ে বলা হয়েছে। ইউএনও আরো জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সিরাজুল ইসলামের পরিবার এবং আশপাশের লোকজনের সাথে সংস্পর্শে আসা সবাইকে চিহ্নিত করে তাদের পরিবারগুলোকে লকডাউন করা হবে।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *