কত টাকা হলে আসলে আপনি বিয়ে করতে পারবেন?

আমি যখন বি এস সি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তখনি বিয়ে করে ফেলি ২০১২ সালে, আমার সহধর্মিণীও তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। আমাদের বাড়ি একই শহরে ছিল , পাশাপাশি পাড়াতে। তখন আমার বয়স হবে ২২ কি ২৩। পারিবারিকভাবেই বিয়ে দেয়া হয়েছিল, দুইজন দুই প্রতিষ্ঠাণে পড়তাম, আমি ঢাকায় আর সে অন্য একটি জেলা শহরে। মাঝে মাঝে আমি তার কাছে যেতাম, মাঝে মাঝে সে আমার কাছে আসতো ঢাকায় , আর দুইজনের ছুটি থাকলে দুইজনই আমাদের বাড়িতে চলে যেতাম। আমি তখন দুই একটা টিউশনি করাতাম ঢাকায়, অনেকদুর হাটতে হত খোঁড়া পা নিয়ে কষ্ট করে , কিন্তু সেই টাকায় যখন আমি আমার বউকে জামা কাপড়, গিফটস কিনে দিতাম তখন অনেক ভাল লাগতো।

স্ট্রাগল করার মাঝে একটা আলাদা মজা আছে , সম্মান আছে। আমার বউয়ের বলতে গেলে তেমন কোন চাহিদাই ছিলনা এটা সেটা কিনে দেয়ার যেটা আমার জন্য সহায়ক ছিল, আর সে কোনদিন আমাকে অসুস্থ মনে করতো না, একজন সুস্থ মানুষ হিসাবে ট্রিট করতো, ইভেন আমার খুড়িয়ে হাটাকে কোনদিন তাকিয়েও দেখতো না। দুইজনের পড়াশুনা শেষ হলে, আমি একটি জবের জন্য অনেক চেষ্টা করতে থাকি, কিন্তু ফ্রেশার বলে সহজে দ্রুত কোন জব পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একটি আইটি ফার্মে এন্ড্রয়েড ডেভেলপার ইন্টার্ন হিসাবে যোগদান করি মাসিক ১২ হাজার টাকা এলাউন্স হিসাবে। আমরা এক্রুমের একটি বাসা ভাড়া নেই ছাদের উপরে ৫ হাজার টাকায়। এইরকম এক্রুমের আলাদা বাসা পেতে আমাকে প্রচুর হাটতে হয়েছে অলি গলিতে, ব্যাথায় পা টনটন করতো। অনেক বাসাআলা আবার প্রতিবন্ধী দেখে তার উপরে এত কম বয়স্ক বিবাহিত দেখে বাসা ভাড়াও দিতে চাইতো না। আমার স্ত্রী কোথায় থেকে পাশ করেছে শুনলে বিশ্বাস করতে চাইতো না, তাদের ধারনা এত হাই প্রোফাইলে পড়া একটি মেয়ে আমার মত একজন প্রতিবন্ধী ছেলেকে কিভাবে বিয়ে করতে পারে, যেটা এখনো ১০০ জন মানুষ শুনলে ৯০ জন মানুষই ভ্রূ কুঁচকায় এবং নেতিবাচক ভাবতে শুরু করে বিধায় আমার স্ত্রীর পরিচয় আমি কাউকে দিতে দ্বিধাবোধ করি। যাই হোক ৭ তালা বিল্ডিং এর ছাদের চিলেকোঠা টাইপ রুমে আমরা টুনাটুনি বসবাস শুরু করি। মাসে দুইজনের খাবার খরচ বাবদ ৩ হাজার টাকার বেশী লাগতো না, যেহেতু আমরা আহামরি খাবার খেতাম না সবসময়, একটা মুটামুটি লেভেলের খাবার রুলস মেইনটেইন করতাম। আমার অফিস কাছেই ছিল, যাতায়াত ভাড়া লাগতো ৫০০-৬০০ টাকার মত। আমরা মাঝে মাঝে ছাদের বাগানে কফি খেতাম গল্প করতাম , জোসনা বিলাস করতাম ছাদের ফ্লাটে থাকার সুবাদে একমাত্র আমরাই ছাদে যাওয়ার সুযোগ পেতাম। আমাদের রুমে আলমারি বলতে কিছু ছিলনা, মেসের মতই ফ্লোরিং করে থাকতাম আমরা। মাস শেষে আমার হাতে আরও এক দুই হাজার টাকা বেচে থাকতো তখন আমরা সিনেমা দেখতে যেতাম, ঘুরতে যেতাম, অথবা শপিং কিংবা কোন রেস্টুরেন্ট। আসলে প্রয়োজনীয়তা আসে নিজের এবং সঙ্গীর চাহিদার গ্রাফ থেকে। আমাদের দুইজনের খুব বেশী ডিমান্ড ছিলনা, সাধারন মানের জীবন যাপন করলেও কচি বয়সে বিয়ে করে জীবনের যে রোমান্টিকতা, যে অমৃত স্বাদ পাওয়া যায় তা আর কোন বয়সে পাওয়া যায়না। আমার নিজের এই ঘটনা বলার উদ্দেশ্য ছিল মাঝে মাঝেই অনেক মানুষের কনফিউজড পোস্ট দেখি কত টাকা হলে আসলে বিয়ে করা যায়, ঢাকা শহরে সংসার করা যায়। আমি এটার উত্তর কি জানি না, এটার উত্তর আপনারাই জানেন। কারন আপনাদের চাহিদা কতটুকু এবং একচুয়েলি আসলে আপনাদের কি দরকার সেটার উপরে নির্ভর করে। আপনি চাইলে আপনার ৫০ হাজার টাকাও লাগতে পারে সংসার স্টার্ট করতে আবার চাইলে আমার মত ১২ হাজার টাকা দিয়েও করতে পারেন। টাকা জীবনে আসবে যাবে , কিন্তু সঠিক সময়ে বিয়ের যে মজা সেটা চলে গেলে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও ফেরত আনতে পারবেন না। বিয়ে আপনাকে নতুন ভাবে স্ট্রেংথ এনে দেয়, আপনার হতাশা দূর করে, আপনার মধ্য সঞ্জিবিনী শক্তি বাড়িয়ে দেয় , কেন বললাম জানেন কারন আমার বিয়ের আগের সেমিস্টরগুলার রেজাল্টের স্কোরের চাইতে বিয়ের পরের সেমিস্টারের রেজাল্টেগুলার স্কোর বেশী ছিল। তাই আবারও চিন্তা করে বলুন আসলে কত টাকা লাগে বিয়ে করতে?

লেখকঃ জাফর আহমেদ।

Categories:মতামত
Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *