অনেক রোগের ওষুধ হচ্ছে কান্না!!

কাজী আবুল মনসুর  :

আমরা ছোটবেলায় মা, বাবা বা শিক্ষকের মার খেয়ে অনেক কেদেঁছি। আবেগজনিত চাপ, কোন কষ্ঠ, মৃত বাবা বা মায়ের জন্যএখনও কাদিঁ। কিন্ত এখনকার ছেলেমেয়েদেও কাদঁতে দেখিনা। তারা জেদি। প্রযুক্তি কান্নার আবেগ তাদের কাছ থেকে কেড়েঁ নিয়েছে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি, আমার ছেলেমেয়েদের যে কোন উছিলায় কাদাঁয়। মাঝে মাঝে তারা কাদুুঁক। সবার উচিত ছেলেমেয়েদের কান্না করানো। এতে তাদেও জীবনিশক্তি বাড়বে। তাদের মধ্যে থেকে যে আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে তা যে কোন মূল্যে ফিরিয়ে আনা জরুরী। অন্যথায় বাবা-মা’র মৃত্যুতেও তাঁরা কাদঁবে না। আবেগ এখন ঢুকে গেছে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে।

জম্মের পর মানবশিশু প্রথম যে কাজটি করে তা হচ্ছে কান্না। কান্না দিয়েই শুরু হয় মানবজীবন। কান্নার জটিল রহস্য এখনও বিজ্ঞানীদের অজানা। গবেষনার শেষ নেই। কান্নার যে অশ্রুধারা কিভাবে কোথা হতে বৃষ্টির মতোন ঝরে এখনও কেউ বের করতে পারেনি। মানুষের মাঝে দুঃখ, কষ্ঠ, ব্যাথা, আবেগ, মানসিক চাপ, মান-অপমান অনেক কারনে মানুষ কাদেঁ। এক সময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানুষ কাদেঁ, কারণ এ অশ্রু চোখের ময়লা পরিস্কার করে। চোখকে ময়লাজনিত ক্ষতি হতে রক্ষা করার জন্য কান্না করেন মানুষ। কিন্ত এখন কবি, বিজ্ঞানী, মনোবিদ কেউ তা বিশ্বাস করেন না। তবে এ কান্না নিয়ে বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, অশ্র“ নির্গত চোখের তিনটি স্তর দিয়ে। চোখের উপরিভাগে আছে তিনটি স্তর। সবচেয়ে নিচের স্তরের নাম মিউকয়েড স্তর। চোখের ভেতরে যে কোষ আছে সেখানে জম্ম হয় অশ্র“ কনার। মিউকয়েড স্তর অশ্র“ কনাকে চোখের কর্নিয়ার উপর ছড়িয়ে দেয়। চোখের উপরিভাগে রয়েছে ল্যাকমিরাল গ্রন্থি। এ গ্রন্থি থেকে চোখের জলিয় স্তরটি আমরা অনুভব করি। চোখকে ভেজা ও মসৃন রাখাটাই এর কাজ। চোখের পাতার প্রান্তদেশে অর্থাৎ সবচেয়ে বাইরের যে তৈলাক্ত স্তর এটি নিয়ন্ত্রন করে ক্ষুদ্র গ্রন্থি, যা থেকে নিঃসরণ হয়ে এটি তৈলাক্ত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটি কান্না নিয়ন্ত্রন করে।
একজন মানুষ প্রতি মিনিটে ১৬ বার চোখের পাতা উঠা-নামা করে। এর ফলে চোখের ভেতরের দুষিত পদার্থ কোণায় জমা হয়। এখানে রয়েছে নিস্কাশন চ্যানেল। অল্প স্বল্প অশ্র“র সাথে বেরিয়ে যায় এ দুষিত পদার্থও। কিন্ত কেউ যখন অঝোর ধারায় কাদেঁ তখন ব্যাপারটি হয় আলাদা। এ কান্নার সাথে সক্রিয় হয়ে উঠে ল্যাকমিরাল গ্রন্থি। কান্না তখন স্রোতের মতোন চোখ দিয়ে চিবুক গড়িয়ে, কিছু কিছু নাক দিয়ে নির্গত হয়। কেন মানুষ আবেগ জনিত কারনে কাদেঁ এ প্রশ্ন আমার আপনার মতোন অনেকের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসে। ১৯৭২ সালের প্রাণ রসায়নের এক ছাত্র উইলিয়াম ফ্রে সর্বপ্রথম কান্নার উপর গবেষনা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি সর্বপ্রথম উলে¬খ করেন, অশ্র“কে সাধারন পানির মতোন মনে হলেও তা সঠিক নয়। যন্ত্রনা, আবেগ বা দুঃখ কষ্ঠের যে অশ্র“ নির্গত হয় তাতে সাধারন অশ্র“ও চেয়ে প্রোটিনের পরিমান বেশি। মানুষ গড়ে কতবার কাদেঁ, কি কারনে কাদেঁ, কাদাঁর পর কেমন বোধ কওে তা নির্নয়ের জন্য ফ্রে একটি গবেষণা চালান। ১৮ থেকে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত এমন ৩৩১ জনকে কান্নার উপর বিস্তারিত লিখতে বলেন। তাতে দেখা যায়, এক মাস বা ৩০ দিনে পুরুষের গড় কান্না ১ দশমিক ১৪ বার। আর মহিলাদেও ৫ দশমিক ৩ বার। কাদাঁর পরে ভালো বোধ করে এমন মহিলার সংখ্যা ৮৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা ৭৩ শতাংশ। সুস্থ মহিলার মধ্যে ৬ শতাংশ এবং সুস্থ পুরুষের মধ্যে ৪৬ শতাংশ ৩০ দিনে একবারও কাদেঁনি। এ গবেষণায়, খুশিতে গড়িয়ে পড়া অশ্র“ থেকে কষ্ঠের অশ্র“ও রয়েছে। পুরুষ মানুষ রেডিও, টিভি বা সিনেমার দুঃখজনক কিছু মন দিয়ে দেখলে কাদেঁ। একইভাবে ব্যক্তিগত সর্ম্পকের কারনেও কাদেঁ পুরুষ। মহিলাদের কান্নার প্রধান কারণও ব্যাক্তিগত সর্ম্পক এবং প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদ। মেয়েদের কান্নার বেশিরবাগ আবেগ নির্ভর। দুঃখ পেলে ৪৯ শতাংশ,সুখের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ, রাগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ নারী অঝোরে কাদেঁন। কিন্ত কোন পুরুষ রাগের কারনে কাদেঁ না এমনটি বলেছেন ফ্রে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, আলসার ও কোলিটিস রোগ দুটির সাথে কান্নার সর্ম্পক আছে। পিটার্সবাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাইকোথেরাপিস্ট মার্গারেট টি ক্রিপিও এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা করেছেন। আলসার, কোলিটিস ও কিছু সুস্থ ব্যাক্তির যারা এ রোগ দুটি থেকে মুক্ত, এ রকম ১৩৭ জনের উপর সার্ভে চালায়। দেখা যায় অসুস্থদের চেয়ে সুস্থরাই বেশি কাদেঁ বা কাদঁতে ভালোবাসে। কাদতেঁ লজ্জা করে না। আলসার রোগে আক্রান্ত একজন রোগি মন্তব্য করেছেন, আমি বুঝি কাদাঁ ভালো। আমার কাদাঁ প্রয়োজন। কিন্ত পারি না লজ্জার কারণে।কান্নার সময় কেউ আমাকে দেখলে আমি দুর্বল হয়ে পড়ি। চঞ্চলতা আমাকে ঘিরে ধরে। নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলি। কাদঁতে না পারার কারনে অনেক সময় অবসাদগ্রস্ততা আমাকে গ্রাস করে নেয়।’ আর একজন সুস্থ মহিলা লেকেন,দুঃখ, অবসাদ আর রাগের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া থেকে আমাকে বিরত রাখে কান্না। কান্নার কারনে এসব জ্বালা থেকে রেহাই পাই আমি।’ একজন মন্তব্য করেন, কান্না আত্মার জন্য ভালো।

কেন মেয়েরা বেশি কাদেঁ। এ প্রশ্নের উত্তরে ফ্রে উল্লেখ করেন, সমাজে মহিলাদের কান্না দোষের কিছু নয়। কিন্ত কোন বয়স্ক পুরুষ তো দুরের কথা ৮-১০ বছরের কোন ছেলেও যদি কাদেঁ তখন এমন প্রশ্ন করেন সবাই ‘আরে এত বড় ছেলে আবার কাদেঁ’। দীর্ঘ দিন ধরে চলতে এ ধরনের মন্তব্য পুরুষদের কান্না কমিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে মানসিক দুশ্চিন্তা, চাপ বা নানা কারনে মহিলারা সহজে কেদেঁ ফেলে। পরবর্তিতে তারা নেশা বা অন্য কোনভাবে ঐ দুশ্চিন্তা চেপে রাখার চেষ্টা করে। তাই পুরুষের তুলনায় মহিলাদের মানসিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ বেশি। মহিলারা পুরুষের তুলনায় বেশি কান্না সর্ম্পকে ফ্রে যা উল্লেখ করেছেন তা হলো, বাচ্চা অবস্থায় ছেলে ও মেয়ে উভয়ের কান্নার প্যাটার্ন একই রকম। কিন্ত বয়ঃসন্ধির পর তা আলাদা হয়ে যায়। এ সময় মহিলার ৪ গুন বেশি কাদেঁ। প্রোলেকটিন নামের একটি হরমোন ১২ বছরের আগে ছেলে ও মেয়দের দেহে সমপরিমান থাকে। কিন্ত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের দেহে এর পরিমান ৬০ ভাগ বেড়ে যায়। এ হরমোনের সাথে মেয়েদের বুকের দুধ উৎপাদনের বিষয়টি জড়িত থাকলেও ফ্রে’র মতে এটির সাথে কান্নার সম্পর্কও অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।
এখন এটি চিরন্তন সত্য হয়ে দাড়িয়েছে,যে, আমাদের শরীর ও মনের জন্য কান্না উপকারী। কান্না একটি স্বাভাবিক দৈহিক প্রক্রিয়া। আর তাই বিভিন্ন আবেগের প্রেক্ষিতে কাদঁতে লজ্জার কিছু নেই। আর এ অশ্রু বিসর্জনের ফলে রেহাই মিলবে অনেক রোগ থেকে। চালর্স ডিকেন্স যেমনটি বলেছেন, কান্না শরীরের ভেতর পরিস্কার করে, চোখের ব্যয়াম করে, চোখের আবজর্না পরিস্কার করে, চোখকে নরম রাখে। অতএব কেদেঁ যাও।

Categories:মতামত
Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *