অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন আসছে ডিসেম্বরেই।

অবশেষে সকল অপেক্ষার পালা শেষ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকার যৌথ উদ্যগে তৈরী করোনা ভ্যাকসিন চ্যাডক্স-১ (কোভিশিল্ড) সর্বসাধারনে প্রয়োগের জন্য বাজারে আসছে এই ডিসেম্বরেই। গতকাল এমনটিই ইংগিত দিয়েছেন অক্সফোর্ডের গবেষকগণ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসের (এনএইচএস) প্রধান দেশটির সকল হাসপাতাল এবং জিপি সার্ভিসকে ক্রিসমাসের আগেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের সকল প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।

এই বছরে প্রথম চালানে ৪০ লক্ষ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে অ্যাস্ট্রাজেনিকা। ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে কোম্পানিটির সাথে ১০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজের চুক্তি করে ফেলেছে। তবে অ্যাস্ট্রাজেনিকা প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাজ্যকে সরবরাহ করবে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন, যা দিয়ে দেশটির দেড় কোটি দূর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৃদ্ধ মানুষদের রক্ষা করা হবে। পরবর্তী ৭ কোটি ডোজ সরবরাহ করা হবে দ্বিতীয় চালানে। অ্যাস্ট্রাজেনিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৪০ কোটি এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে ৪০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজের চুক্তিতেও আবদ্ধ যা তারা সরবরাহ করবে আগামী বছরের পুরোটা সময় ধরে।

বর্তমানে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তাদের ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইন্ডিয়ায়। ফেইজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ২ বছর। তবে বর্তমানকার করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে ট্রায়ালের মধ্যবর্তী ফলাফল পর্যালাচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনিকা। গত তিন সপ্তাহ ধরে ইউরোপের রেগুলেটরি বডি (ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি) অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ফেইজ-৩ ট্রায়ালের রোলিং রিভিউ শুরু করে দিয়েছে। রিভিউ ত্বরান্বিত করতে যুক্তরাজ্য তাদের নিজ দেশের রেগুলেটরি বডির (এমএইচআরএ) মাধ্যমেও ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ফলাফল রিভিউ করছে। এই রিভিউতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ফাইজারের এমআরএনএ ভ্যাকসিন ট্রায়ালকেও। তবে রেলিং রিভিউ রিপোর্ট প্রথমে পাওয়া যাবে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন ট্রায়ালের এ মাসেই।

পূর্ববর্তী ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সের ভলান্টিয়ারদের উপর চালানো ফেইজ-২ ট্রায়ালে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন বেশ আশানুরূপ ফলাফল দেখিয়েছিল। আর গত মাসের ব্রিফিংয়ে দেয়া দ্বিতীয় ধাপের ফেইজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তারা দেখিয়েছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ বয়েসের (৬৫+ বছর) মানুষের উপরও বেশ ভালভাবেই ইমিউনোজেনিক রেসপন্স ঘটাতে সক্ষম এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অপেক্ষাকৃত অনেক কম। অর্থাৎ এই ভ্যাকসিনটি বৃদ্ধ জনগোষ্ঠির উপরও বেশ কার্যকরী।

অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন যখন মোটামুটি প্রস্তুত ঠিক সে সময়টিতে বাংলাদেশ সরকার চুক্তিবদ্ধ হল ইন্ডিয়ার সেরাম ইনিস্টিটিউটের সাথে। তারা বাংলাদেশে বেক্সিমকোর মাধ্যমে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। প্রথম পর্যায়ে ৬ মাসে বাংলাদেশ পাবে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন যা সর্বপ্রথম দেয়া হবে দেশের দেড় কোটি স্বাস্থকর্মী এবং বৃদ্ধ মানুষকে। সেরাম ইনিস্টিটিউট নিন্ম এবং মধ্য আয়ের দেশগুলির জন্য ভ্যাকসিন প্রস্তুত করবে।

বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তটি বেশ প্রশংসার দাবী রাখে। সরকার দেশের মানুষের জন্য এমন একটি ভ্যাকসিন বেছে নিল যা তৈরী করছে স্বনামধন্য অ্যাস্ট্রাজেনিকা এবং যার সৃস্টি হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ অক্সফোর্ড এবং ভ্যাকসিনের সূতিকাগার জেনার ইন্সটিটিউটে। এছাড়াও ভ্যাকসিনটি বাংলাদেশের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির কোল্ড চেইন সিস্টেমের সাথে মানানসই। প্রায় ৫০০ টাকা মূল্যের এই ভ্যাকসিনটি ৪ থেকে ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন এবং বিতরন করা যাবে। বেশ কিছুদিন আগে আমি একটি ভ্যাকসিনের তালিকা করেছিলাম। সেই তালিকায় সবার উপরে ছিল অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন এবং সর্বনিন্মে ছিল সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন। সরকার সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনের সাথে কোন প্রকার ট্রায়াল বা ক্রয় করার চুক্তি না করে অত্যাধিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে।

তবে এসব কিছুর পরেও কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আর তা হল: (১) বাংলাদেশ কবে নাগাদ অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন পাবে তা কিন্তু এখনও অজানা। সরকার আজ যে চুক্তি করলো এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশ বিভিন্ন কোম্পানির সাথে অনেক আগেই করেছে। (২) ভারতের করোনা পরিস্থিতি খুবই নাজুক, সেক্ষেত্রে সেরাম ইনিস্টিটিউট হয়তো সর্বপ্রথম ভারতের ভ্যাকসিন চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাবে। তাহলে আমাদেরকে তারা কিভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে, সেই ব্যাপারটা পরিস্কার হওয়া দরকার। ভ্যাকসিন একটি বায়োলজিক প্রডাক্ট, এর কাঁচামাল তৈরী হতে হবে সেরাম ইনিস্টিটিউটেই, সেক্ষেত্রে বেক্সিমকো হয়তো শুধু ফিল-ফিনিশ করবে। বায়োলজিক প্রডাক্ট প্রস্তুতি একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। (৩) বাংলাদেশর উচিত হবে আরও দু’ একটি কোম্পানির সাথে ভ্যাকসিনের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হওয়া, যেমন ফাইজার বা রাশিয়ার গ্যামালিয়া ইনিস্টিটিউট। স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটি লাইয়োফিলাইজড ভ্যাকসিন যা বাংলাদেশের কোল্ড চেইনের তাপমাত্রার সাথে মানানসই। (৪) একাধিক উৎসের ভ্যাকসিন ছাড়া আমাদের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। (৫) আমরা কিন্তু এখনো জানিনা যে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটি আদৌ কার্যকরী কি না। কারন ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি!

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম,
এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,
সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট,
শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

Tags:

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *